মোঃ আবু হানিফ বিন সাঈদ
বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের সূচনালগ্নে—বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে—বজ্রপাতের মাত্রা বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের তীব্রতা ও বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর শিকার হন মূলত গ্রামীণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা মাঠে কাজ করার সময় খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেন। অথচ, কিছু সাধারণ সতর্কতা ও সচেতনতা মেনে চললেই এই প্রাণঘাতী দুর্যোগ থেকে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, উঁচু গাছের নিচে, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা ধাতব বস্তুর আশপাশে অবস্থান করা বিপজ্জনক। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই এ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, যা ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া গবাদি পশু বা ফসল রক্ষার চিন্তায় অনেক কৃষক মাঠে থাকেন, যা তাদের মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
সরকার ইতোমধ্যে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে এখনো মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুল-কলেজে সচেতনতা ক্লাস, পোস্টার, মাইকিং ও স্থানীয় ইমাম, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো জরুরি।
প্রযুক্তির সাহায্যেও বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব। যেমন, সম্ভাব্য বজ্রপাতের সময় ও এলাকা সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা এসএমএস ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানানো যেতে পারে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টর) স্থাপন এবং গ্রামের বিদ্যালয়গুলোকে ‘বজ্রপাত নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এছাড়া গবাদি পশুর জন্য আলাদা নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কৃষকরা ঝুঁকি নিয়ে মাঠে না গিয়ে নিজে এবং পশুর জীবন রক্ষা করতে পারেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।
বজ্রপাতকে প্রতিরোধ করা না গেলেও, সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় সম্প্রদায়কেও এতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
অতএব, বজ্রপাতকে অবহেলা নয়—বরং এটিকে একটি ভয়াবহ বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে, সম্মিলিত সচেতনতা, সতর্কতা ও প্রয়োগযোগ্য উদ্যোগের মাধ্যমেই বজ্রপাতে অকালমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব। এখনই সময়, এই প্রাণঘাতী দুর্যোগের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার।