স্টাফ রিপোর্টার : হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। এর ফলে বনের প্রাণীরা গহীন অরণ্য ছেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং বন্যপ্রাণীদের জীবনও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বিশেষ করে বানর ও মায়া হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী প্রায়ই লোকালয়ের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। পর্যটক ও স্থানীয়দের মতে, বানররা এখন খাবারের জন্য সরাসরি মানুষের দিকে ছুটে আসে। অনেক পর্যটককেই বানরদের কলা বা অন্যান্য খাবার দিতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, হরিণের দলও দিনের বেলায় লোকালয়ের কাছাকাছি লেবু বাগানে চলে আসছে, যদিও তারা সহজেই মানুষের শব্দে পালিয়ে যাচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রায় ২৪৩ হেক্টর বা প্রায় ৬০০ একর এলাকায় বিস্তৃত। এই উদ্যানে রয়েছে প্রায় ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তু, যার মধ্যে রয়েছে ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ১৫০ থেকে ২০০ প্রজাতির পাখি।
বনে রয়েছে শাল, সেগুন, আগর, গর্জন, চাপালিশ, পাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, জাম, জামরুলসহ প্রায় ২০০ প্রজাতির গাছপালা। তবে অপরিকল্পিত বনায়ন, অবৈধভাবে লেবু বাগান তৈরি এবং প্রভাবশালী মহলের দখলদারির কারণে এই জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে।
সাতছড়ি ত্রিপুরাপল্লীর হেডম্যান চিত্তরঞ্জন বর্মা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “প্রাণীরা এখন আর বনে টিকতে পারছে না, খাবারের সন্ধানে বাধ্য হয়ে লোকালয়ে আসছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাতছড়ির রিজার্ভ ফরেস্টের অন্তত ৪০০-৫০০ একর জমি দখল করে তৈরি করা হয়েছে বাণিজ্যিক লেবু বাগান, যা বনাঞ্চলের ভারসাম্য ধ্বংস করছে। বনের খাবার ও আবাসস্থল হারিয়ে ফেলা প্রাণীরা লোকালয়ের দিকে চলে আসছে, ফলে দুর্ঘটনাও বাড়ছে। ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়ক পার হওয়ার সময় অনেক বানর যানবাহনের ধাক্কায় মারা যাচ্ছে বা পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।
বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যদিও প্রাথমিকভাবে এই পরিস্থিতিকে “স্বাভাবিক আচরণ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন, পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা একে অস্বাভাবিক এবং বিপজ্জনক প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।
জাতীয় উদ্যান ঘুরতে আসা পর্যটক জসিম মিয়া বলেন, “বানরগুলো মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এরা অলস হয়ে পড়ছে, যা প্রাকৃতিক আচরণের পরিপন্থী।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু প্রাণী নয়, পুরো বনাঞ্চল পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। দ্রুত অবৈধ দখলদারি বন্ধ, লেবু বাগান উচ্ছেদ ও বনাঞ্চলে স্বাভাবিক খাদ্যচক্র পুনরুদ্ধারই হতে পারে একমাত্র সমাধান।