
স্থানীয়দের মাঝে আশা জাগিয়ে চোখের সামনে গড়ে উঠেছিল হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বহুল আলোচিত বাল্লা স্থলবন্দরের অবকাঠামো। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি আর কার্যকর হলো না। গত সপ্তাহে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের ৪০তম বৈঠকে এ বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। এর ফলে বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং সেখানকার মূল্যবান অবকাঠামো লুটপাট ও বেদখলের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মূলত সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়মুড়া এলাকায় কোনো স্থলবন্দর গড়ে না ওঠায় শুরু থেকেই বাল্লার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এর পরও ওয়্যারহাউস, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড, ট্রাক পার্কিং ইয়ার্ড, প্রশাসনিক ভবন ও ডরমিটরিসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সর্বাধুনিক স্থলবন্দরের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্থলবন্দরে মানুষের আনাগোনা নেই। আধুনিক ভবনগুলোতে এরই মধ্যে ক্ষত দেখা দিতে শুরু করেছে। মরিচা ধরেছে দরজা-জানালা ও যন্ত্রাংশে, প্রাঙ্গণে জমেছে ময়লা। ভেতরে স্থানীয়দের ছাগল চরে বেড়াচ্ছে। বিশাল অবকাঠামো এখন কার্যত গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ বাল্লা স্থলবন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ১৩ একর জমি অধিগ্রহণের পর ২০২৩ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে সরকারের প্রায় ৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর আগেই স্থগিত হওয়ায় এখন সেটি অচল পড়ে আছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া স্থলবন্দর নির্মাণ করায় সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হলো।
চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, “কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বন্দর অরক্ষিত হয়ে পড়বে। এখনই রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে, নইলে বেদখল হয়ে যাবে।”
চুনারুঘাট ইউএনও মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি সদ্য যোগদান করেছেন। খোঁজ নিয়ে বাল্লা স্থলবন্দর যাতে বেদখল না হয়, সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুনারুঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মীর সিরাজ অভিযোগ করেন, “লোক দেখানো উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা নষ্ট করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া এত টাকা খরচ করে বন্দর বানানো হয়েছে, যা এখন অচল।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী সিরাজ মিয়া বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম বন্দর চালু হলে ভারতীয় বাজারের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করতে পারব। কর্মসংস্থান তৈরি হবে, অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু সব স্বপ্ন এখন ভেঙে গেছে।” আরেক ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভারতের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়াই এত টাকা খরচ করে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন সেটি গোচারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা শামীম আলম বলেন, “কোটি টাকার অবকাঠামো এখন ছাগলের চারণভূমি। সরকার অবকাঠামো রক্ষায় ব্যবস্থা নিক এবং ভবিষ্যতে এর ব্যবহার নিশ্চিত করুক।”
স্থলবন্দর নির্মাণের আগে শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। অনেকেই ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এখনও ১৩টি পরিবার বন্দরের সীমানার ভেতরে বসবাস করছেন। ইদ্রিস আলী নামে এক ক্ষতিগ্রস্ত বলেন, “৫ শতক জমি বন্দর এলাকায় পড়েছিল। সরকার ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও টাকা পাইনি। জমিও গেল, বন্দরও হলো না।”
উল্লেখ্য, বাল্লা শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর ঘোষণার পেছনে ভূমিকা ছিল হবিগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি মাহবুব আলীর। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া শায়েস্তাগঞ্জের অশোক মাধব রায় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব থাকাকালে এর প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
সাধারণ মানুষ মনে করছেন, স্থলবন্দর চালু হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতো এবং সীমান্ত বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলত। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উন্নয়নের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। এখন শঙ্কা দেখা দিয়েছে, কোটি টাকার এই প্রকল্প বেদখল হয়ে দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।