
নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির ৩ যুগ্ম আহ্বায়কের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে আত্মপক্ষ সমর্থনের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলহাজ্ব ছাবির আহমদ চৌধুরীর সদস্যপদ স্থগিত করার ঘটনায় তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এনিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পরপর দুইবার দলীয় প্রতীক (ধানের শীষ) নিয়ে নির্বাচিত সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি ছাবির আহমদ চৌধুরী।
২০১৫ ও ২০২১ সালের দুটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী প্রার্থীকে হারিয়ে চমক দেখান তিনি। বিগত আন্দোলন সংগ্রাম ও জনপ্রিয়তার নিরিখে ছাবির চৌধুরীকে গত পৌর নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় দলীয় প্রতীক (ধানের শীষ) দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী মন্ত্রীর জামাতাকে পরাজিত করে বিজয়ী হন তিনি। গত পৌর নির্বাচনে সিলেট বিভাগে ২-৩ বিজয়ীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
১৯৮৮ইং সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে নবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে পৌরসভা গঠিত হওয়ার পরে ১৯৯৯ সালে প্রত্যক্ষ ভোটে পৌর বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একাধিকবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের উপ-নির্বাচনে হবিগঞ্জ-০১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে দলীয় প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়াকে বিজয়ী করতে নির্বাচনের প্রধান কনভেনার হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এটাই ছিল তৎকালীন সময়ে সিলেট বিভাগে দলের একমাত্র আসন। সেই ছাবির চৌধুরীকে কোনো প্রকার কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই গত ২২ আগস্ট প্রাথমিক সদস্যপদসহ তার রাজনৈতিক পদবী স্থগিত করে বিএনপি। দলের ৩ যুগ্ম আহ্বায়কের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত পত্রে এই স্থগিতাদেশ জারি হয়।
ছাবির আহমদ চৌধুরীর দাবি, অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতার দাপটে ভিত্তিহীন অভিযোগে তার সদস্যপদ স্থগিত হয়েছে। এ নিয়ে তৃণমূল বিএনপিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। টানা দুইবার দলীয় প্রতীক নিয়ে বিজয়ী মেয়র ও আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতা হিসেবে একাধিক রাজনৈতিক মামলার আসামি তিনি। তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়নি। দ্রুত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছেন দলের নেতাকর্মীরা।
লিখিত অভিযোগ ও দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির কাউন্সিল নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। ৯টি ওয়ার্ড কমিটি গঠিত হলেও কাউন্সিল নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। এনিয়ে ঢাকায় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় গুলশানে বিদ্যমান দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে মিলিত হন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এম. জেড. জাহিদ হোসেন। এ সময় সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জিকে গউছ ও সাবেক মেয়র ছাবির আহমদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে গত ১১ আগস্ট নবীগঞ্জ শহরের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে কাউন্সিল কেন্দ্রিক বৈঠকে মিলিত হন জিকে গউছ, কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী সদস্য শেখ সুজাত মিয়া ও ছাবির আহমদ চৌধুরী। সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিটি ওয়ার্ড কমিটি যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। একপর্যায়ে একটি ওয়ার্ডের বাছাই স্থগিত রেখে মাগরিবের নামাজে যান নেতৃবৃন্দ। এসময় পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আমিনের সাথে আনমনু গ্রামের কয়েক কর্মীর বাকবিতণ্ডা হয়। জিকে গউছ ওই কর্মীকে বিএনপি নেতা নুরুল আমিনের নিকট ক্ষমা চাইতে বলেন। এ অবস্থায় একটি মাত্র ওয়ার্ড কমিটি বাছাই ও কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ না করেই নেতারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এতে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। নবীগঞ্জ পৌর বিএনপির কাউন্সিল ছাড়াই হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিল ঘোষণা দেয়া হয়।
পরে ৩ যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী, নুরুল আমিন ও অরবিন্দু রায় সাবেক মেয়র ছাবির চৌধুরীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, মব জাস্টিস সৃষ্টি, মামলা বাণিজ্য, দাঙ্গা সৃষ্টি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লোপাট ও অগ্নিসংযোগ করে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনেন।
সম্প্রতি শহরের আনমনু ও তিমিরপুর গ্রামবাসীর মধ্যে কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘাত নিরসনে সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে সালিশ কমিটি গঠিত হয়। ওই শালিস কমিটির উপদেষ্টা সদস্যদের মধ্যে অন্যতম সদস্য ছিলেন ছাবির আহমদ চৌধুরী। দুই গ্রামের সংঘাতকালে তিনি মক্কায় হজ্ব গমনরত ছিলেন। ৬ জুলাই দুপুরে দেশে ফেরেন।
এ নিয়ে পৌর বিএনপির আহ্বায়ক ছালিক চৌধুরী বলেন, গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে থানায় মামলা হয়নি। এছাড়াও শহরে চাঁদাবাজির ঘটনা বা মব নৈরাজ্য নিয়েও মামলা হয়নি। তাহলে কিভাবে বিএনপির সাবেক সভাপতি ছাবির চৌধুরী মামলাবাজ বা চাঁদাবাজ হলেন, বুঝতে পারছি না।
শহরের ব্যবসায়ী ও পৌর বিএনপি নেতা বিভু আচার্য্য বলেন, মব প্রতিরোধ ও আইন শৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক হলেন ছাবির চৌধুরী। মবের নামে নৈরাজ্য, মামলা বাণিজ্য ও জন হয়রানি বন্ধে সক্রিয় ছাবির চৌধুরীর দলীয় পদ স্থগিত দুঃখজনক ঘটনা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতাকর্মীরা সরব হয়ে বলেন, অভিযোগকারী তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী হলেন ছাবির চৌধুরীর অন্যতম প্রতিপক্ষ এবং সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার বিরোধিতা করে বহিস্কৃতও হন। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দলে যুক্ত হয়ে পারিবারিক বলয়কে প্রতিষ্ঠা করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন তিনি। তার পরিবারের অনেকেই আওয়ামী রাজনীতির সাথে সক্রিয়।
সার্বিক বিষয়ে সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ছাবির আহমদ চৌধুরী বলেন, জনগণ আমাকে পরপর দুইবার মেয়র নির্বাচিত করেছে। দুইবারই দলীয় প্রতীক (ধানের শীষ) নিয়ে বিজয়ী হয়েছি। একাধারে ৩ বার পৌরসভার কাউন্সিলর ছিলাম। দলের সভাপতি ছিলাম। অনেক মামলার আসামি হয়েছি।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কোনো প্রলোভন আমাকে নীতি থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। জীবনের শেষ মুহূর্তেও দলের নীতি-আদর্শে অবিচল থাকব। দুঃখ করে তিনি বলেন, কাল্পনিক অভিযোগে সদস্যপদ স্থগিত করা হয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে আমার কথা শুনলে ভালো হতো। তথাপি আমার কোনো ক্ষোভ নেই। আশা করি দ্রুতই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হবে, এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
বালু মহাল নিয়ে তিনি বলেন, এগুলো হচ্ছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এসবের সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর উপজেলা ও পৌর এলাকার সরকারি স্থাপনা ও সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হই। এতে দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।