1. dailyhabiganjshomoy@gmail.com : shomoy2017 : দৈনিক হবিগঞ্জ সময়
September 13, 2026, 7:51 am

টিলা ধস ও পাহাড়ি ঢল :: অস্তিত্ব সংকটে চুনারুঘাটের ত্রিপুরা পল্লী

স্টাফ রিপোর্টার
  • Updated Monday, September 1, 2025
  • 191

একসময় হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার কয়েকটি স্থানে ত্রিপুরা আদিবাসীদের অবস্থান ছিল। কিন্তু বর্তমানে শুধু উপজেলার সাতছড়িতে চব্বিশটি পরিবার বাস করে। ঘন বন-জঙ্গল, পাহাড়ি ছড়া, চা বাগান ঘেরা একটি উঁচু টিলাতে দীর্ঘকাল ধরে ত্রিপুরাদের বসবাস। টিলা ধসের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দারা।
স্থানীয়ভাবে ‘টিপরা পল্লী’ নামে জায়গাটা পরিচিত। প্রাকৃতিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়ালেখার প্রতি ব্যাপক আগ্রহী তারা। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে পাহাড় ধসের কারণে বাড়িঘর হারানোর শংকার পাশাপাশি চলাচলের জন্য মারাত্মক কষ্টে রয়েছেন ত্রিপুরারা। কোথাও কোন স্থায়ী সুরাহা না পেয়ে এখন তারা বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সহায়তা চান।
টিপরা পল্লীর সামাজিক প্রধান ব্যক্তিকে হেডম্যান বলা হয়। বাবার মৃত্যুর পর এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন চিত্তরঞ্জন দেববর্মা। পাহাড়ি সাতটি ছড়া থাকায় এই জায়গার নাম হয়েছে সাতছড়ি। এখানে তারা হাজার বছর ধরে বসবাস করছেন।
কয়েক বছর আগে ছড়া ও টিলা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। এরপর বিভিন্ন সময় অতিবৃষ্টিতে টিলায় ধস নেমে পাঁচটি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। এখনো ভারি বর্ষণে টিলায় ধস নামা অব্যাহত রয়েছে। যে কারণে টিলাটি সংকীর্ণ হয়ে অন্যান্য ঘরগুলোও হুমকির মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি যাতায়াতে মারাত্মক সমস্যার মধ্যে রয়েছেন তারা।
বৃষ্টি হলেই পল্লীর তিনদিকে থাকা ছড়াগুলোতে পাহাড় থেকে পানির তোড় নেমে আসে ছড়াগুলোতে। এ সময় অতি জরুরি প্রয়োজনেও যাতায়াত করা সম্ভব হয় না।
জানা যায়, ২০১২ সালে উপজেলা প্রশাসন তাদের চলাচলের জন্য একটি পাঁকা সেতু নির্মাণ করেন। কিন্তু পাহাড়ি ঢলের কারণে একপাশের টিলা ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরে ২০২২ সালে ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন সেতু বর্ধিত করলে আবারও চলাচল শুরু হয়। পাহাড়ি ঢলের কারণে টিলা ধসে যাওয়ায় সেতুটি একবছরও টিকতে পারেনি। সেতুটি আবারও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের জীবন ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটকের ঠিক পেছনের একটি ছড়া পেরিয়ে টিপরা পল্লীর টিলার অবস্থান। পূর্বের কয়েকটি ধসের নমুনাও চোখে পড়ে। ধস হওয়া স্থানগুলোতে টিলা একেবারে খাড়া অবস্থায় রয়েছে। সেখানে টিলার ভেতরকার লালমাটি বেরিয়ে এসেছে। টিলা বেয়ে ওপরে উঠে দেখা যায়, কয়েকটি বাড়ি একেবারে টিলার কিনারে হুমকির মধ্যে রয়েছে।
ত্রিপুরা পল্লীর সহকারী হেডম্যান আকাশ দেববর্মা বলেন, আমাদের ছড়ায় বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢল এমনভাবে আসে, যা বলার মতো না। স্কুলের সময় স্কুলে যাওয়া যায় না। কোন রোগী নিয়ে যাইতে পারি না। কয়েক মাস পূর্বে আমাদের পল্লীর একজনের হাত ভেঙেছে, একজন প্রসূতি রোগী ছিল, আমরা ১ ঘণ্টা ছড়ার পাশে ছিলাম। পরে ছড়া থেকে পানি নামার পর রাত ১০টায় রোগী নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বৃষ্টি আসলে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে আমাদের চলতে হয়।
ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দা ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের বন ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সভাপতি সংযুক্ত দেববর্মা বলেন, আমরা সবার কাছে সহায়তার জন্য বলি। কিন্তু বাস্তবে স্থায়ীভাবে কোনো সমাধান হয় না। আমরা খুবই বিপদে আছি। তাই আমরা এখন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবের কাছে চলাচলের জন্য একটা ব্রিজ ও বাড়িঘর রক্ষায় গাইডওয়াল নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
গৃহবধূ সন্ধ্যা দেববর্মা বলেন, পাহাড়ি ঢল যথন আসে, তখন আমাদের যাওয়া আসার খুব কষ্ট হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের স্কুল ও মেডিক্যালে যাওয়া নিয়ে খুবই বিপদের মধ্যে আছি। ড. ইউনূস সাহেব যেন আমাদের দিকে তাকান, এটাই আমাদের চাওয়া। চলার জন্য একটা ব্রিজ ও আর বাড়িঘর রক্ষায় গাইডওয়াল দিলে আমরা খুবই উপকৃত হব।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জীবন ও জীবিকাতে পরিবর্তন এসেছে বলে জানান চিত্তরঞ্জন দেববর্মা। তিনি বলেন, একসময় ছড়াগুলোতে অনেক মাছ থাকত। আমরা মাছ ধরে খেতে পারতাম। এখন ছড়াগুলোতে কোনো মাছ থাকে না। এছাড়াও বনের মধ্যে অনেক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যে কারণে আমাদের জীবন ও জীবিকার ধরণ পাল্টাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, পাহাড়ি ছড়া ও টিলা থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে সাতছড়ি ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দারা চরম ঝুঁকির মধ্যেও বাপ-দাদার ভিটায় বাস করছেন। তাদের বসতভিটা ও চলাচলের জন্য সুব্যবস্থা করা জরুরি।
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম বলেন, ত্রিপুরাদের চলাচলের জন্য একটি পাঁকা ব্রিজ নির্মাণ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ি ঢলের কারণে ব্রিজের একটি অংশ ধসে পড়ে। এছাড়াও চলাচলের জন্য সাতছড়ি চা বাগানের ভেতর দিয়ে একটি বিকল্প রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। টিলা ধসের বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2017 dailyhabiganjshomoy.Com
Developer By Zorex Zira

Designed by: Sylhet Host BD