1. dailyhabiganjshomoy@gmail.com : shomoy2017 : দৈনিক হবিগঞ্জ সময়
September 13, 2026, 8:50 am

দখল দূষণে অস্তিত্ব সঙ্কটে নবীগঞ্জের শাখা বরাক নদী

Reporter
  • Updated Sunday, February 4, 2024
  • 343

জাবেদ তালুকদার : শাখা বরাক নদীর তীরে গড়ে উঠেছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা শহর। এক সময় শাখা বরাক নদী দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করতেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। জেলেদের মাছ ধরাসহ নদীর পানি দিয়ে জমি চাষ করতেন চাষীরা। আজ অবৈধ দখল আর নদীতে ময়লা আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলার কারনে প্রসস্থ কমে গিয়ে খালে পরিনত হয়েছে এ নদীটি। বর্ষা মৌসুমে নদীর দু’কূল ছাপিয়ে বন্যার সৃষ্টি হলেও শুকনো মৌসুমে তা বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়। কচুরিপানার বর্জ্যে ভরপুর হয়ে শাখা বরাক হারাচ্ছে তার স্বাভাবিত চরিত্র। ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও যে নদীতে ৫শ’ মনের ওজনের নৌকা ধান, ইট, বালু নিয়ে যাতায়াত করত। সময়ের পরিক্রমায় সেই খাল দিয়ে রাস্তার ও বসতবাড়ির বৃষ্টির পানি পর্যন্ত ঠিকভাবে নিষ্কাশিত হতে পারছে না। বর্তমানে খালটি নবীগঞ্জ বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহƒত হচ্ছে। খালের ওপর জমেছে ময়লার স্তূপ, যার ফলে নবীগঞ্জ শহরে ড্রেনের পানি নিষ্কাশিত হতে পারে না। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি এ খাল দিয়ে বের হতে না পারায় শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ির উঠানে ও রাস্তায় সব সময় পানি লেগে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, একসময় নবীগঞ্জ বাজারের সঙ্গে দেশের অন্যান্য স্থানের পণ্য পরিবহনের একমাত্র জলপথ ছিল শাখা বরাক। বৃদ্ধদের মুখে শোনা যায়, প্রায় অর্ধশত বছর আগেও শাখা বরাক নদী দিয়ে লঞ্চ চলেছে। ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও চলেছে বড় বড় নৌকা। বাউসা ইউনিয়নের বাঁশডর থেকে বিজনার একটি শাখা কলকলিয়া নামে শুরু হয়ে টুনাকান্দি, চানপুর, চৌধুরী বাজার, বাউসা গ্রামের পাশ পর্যন্ত এসেছে। এরপর বাউসা থেকে কলকলিয়া নদী শাখা বরাক নাম ধারণ করে উত্তর-পশ্চিমমুখী হয়ে নাদামপুর গ্রাম, নবীগঞ্জ বাজার, আক্রমপুর, চরগাঁও, আদিত্যপুর, কানাইপুর, তিমিরপুরের পাশ হয়ে বানিয়াচং উপজেলার কাগাপাশার কাছে প্রবাহিত শুঁটকি নদীতে পতিত হয়েছে। শাখা বরাকের একটি শাখা আক্রমপুরের ব্রীজ (গড়মহলি ব্রীজ নামে পরিচিত) থেকে শাখা বরাক নামেই দক্ষিণমুখী হয়ে পূর্ব তিমিরপুর, সূজাপুর, পাইকপাড়া, বদরদী, মুরাদপুর, আলিপুর, খড়িয়া, চানপুর, কালিয়ারভাঙা, শ্রীমতপুর, লহরজপুর, খলিলপুর, সাদকপুর, সিকন্দরপুর, আলিগঞ্জ বাজার, দৌলতপুর, মোড়ার আব্দা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বালিখাল নদীতে পতিত হয়েছে। চরগাঁও গ্রামের কাছ থেকে শাখা বরাকের আরেকটি শাখা শাখা বরাক নামেই রাজনগর, গন্ধা হয়ে শাখোয়ার কাছে প্রবাহিত পিংলি নদীতে পতিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, শাখোয়া গ্রামের নাম শাখা বরাক নদীর নাম থেকেই হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর উভয় পাড় দখলদারদের কবলে পড়ে প্রশস্থতা হারিয়ে ছোট খালের আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এই নদী পূর্ব তিমিরপুর পর্যন্ত দেখতে খালের মতো। তিমিরপুরের পর থেকে কালিয়ারভাঙা পর্যন্ত নদীর অস্তিত্ব বোঝাই যায় না, এরপর আবার খালের মতো কোনোরকমে টিকে আছে। অধিকাংশ স্থানেই বেদখল হয়ে যাওয়ায় নদীর চিহ্নই আর নেই। নদীর সঙ্গে যেসব খাল সংযুক্ত রয়েছে সেগুলোর অবস্থাও একেবারেই শোচনীয়। নদীটির বিভিন্নস্থানে কচুরিপানা আটকে রয়েছে মাসের পর মাস। নদী তীরবর্তী নবীগঞ্জ বাজারের অনেক বাসার পয়ঃনিস্কাশনের পাইপ সরাসরি নদীতে যুক্ত রয়েছে। এছাড়া গবাদিপশুর বর্জ্য, হাসপাতাল-ক্লিনিকের ময়লা, মুরগির উচ্ছিষ্ট অংশ, পলিথিন ও প্লাষ্টিক বর্জ্র্যসহ নানা ধরনের ময়লা প্রতিনিয়ত মিশে দূষণ হচ্ছে নদীটির পানি। এতে একদিকে কচুরিপানায় সাপ, মশা ও পোকা-মাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে, অন্যদিকে ময়লা অবর্জনায় দূষিত পানিতে মাছের আবাদ ও নৌকা চলাচল যেন দুঃস্বপ্ন। নদী পাড়ের মানুষ নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশন আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, শাখা বরাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী, এ নদী দিয়ে পণ্য এবং যাত্রীবাহী বড় বড় নৌকা চলাচল করতো। কতিপয় অসাধু লোকজন নিজেদের ভোগ-বিলাসের জন্য নদীটিকে দখলের মাধ্যমে অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলেছে। নদীটি দখল-দূষণের ফলে মশা-মাছিসহ নানা কিট-পতঙ্গের উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। যা পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। দখল-দূষণের পাশাপাশি নদী ও পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা এবং উদাসীনতার কারণে নদীটি অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, মানুষ নদী বানাতে পারেনা সুতরাং নদী ধ্বংশ করার কোন যৌক্তিকতা নেই। এটি অন্যায় এবং আইন বিরুদ্ধ। গুরুত্বপূর্ণ এ নদীটি রায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
দিনারপুর কলেজের অধ্যক্ষ তনুজ রায় বলেন, শাখা বরাক নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সচেতন হবে। পৌরসভার ময়লা ফেলার কোন ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় শাখা বরাক নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। নদীর দূষণ রোধে নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে।
সাংস্কৃতিক কর্মী পলাশ বণিক কলেন, বাউশা ইউনিয়নের বাশডর এলাকা থেকে কলকলিয়া নামে যে নদী শাখা বরাক নামে নবীগঞ্জ-বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্ধুর মতো আমাদের আগলে রেখেছে বছরের পর বছর ধরে আজ সেটি আইসিইউতে। অক্সিজেনের লাইনটিও কাটা হচ্ছে জ্ঞানে-অজ্ঞানে। আমরা চাই নদী বাচুঁক, নগর বাচুঁক, নবীগঞ্জের নাগরিক বাচুঁক।
কীর্তিনারায়ন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ফয়জুর রব পনি বলেন, নবীগঞ্জ শহরের প্রাণ শাখাবরাক নদী বছরের পর বছর ধরে চলা দখল ও দূষণে আজ বিলীন প্রায়। সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে এটা মেনে নেয়া কষ্টকর। নদীর প্রতি এই অবিচারের বিরুদ্ধে নবীগঞ্জের সর্বস্তরের জনগণের সোচ্চার হতে হবে। আশা করি কতৃপক্ষ পরিস্তিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2017 dailyhabiganjshomoy.Com
Developer By Zorex Zira

Designed by: Sylhet Host BD