
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও এরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ মানুষ বলছেন, “নবীগঞ্জে এখন বিদ্যুৎ অতিথি, আর লোডশেডিং স্থায়ী বাসিন্দা।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। কিছুদিন পরপরই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় উপজেলার লাখো মানুষকে। তবে চলমান পরিস্থিতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি তাদের।
সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক থেকে দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ এলেও ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি স্থায়ী হচ্ছে না। শহরে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হলেও শহরতলী ও গ্রামীণ এলাকায় ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও এরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাসাবাড়িতে পানির মোটর চালানো না যাওয়ায় দেখা দিয়েছে পানি সংকট। নষ্ট হচ্ছে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী। বিদ্যুৎনির্ভর ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং, ওয়েল্ডিং ও অন্যান্য কারিগরি কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে কাজ চালালেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারছেন না। রাতে ঘুমাতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
লোডশেডিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপরও। বিশেষ করে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা রাতে পড়াশোনা করতে পারছেন না। দিনের বেলাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের মধ্যে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে তাদের। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইমন নামে এক গ্রাহক বলেন, “ঘড়ি দেখে হিসাব করেছি, প্রায় প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ আসে। এভাবে কি স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব?”
আরেক গ্রাহক ফারহান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত তিন-চার দিন ধরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঠিকমতো পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাইনি। শিক্ষার্থীরা পড়তে পারছে না, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রোগীরা কষ্ট পাচ্ছেন। অভিযোগ করতে ফোন দিলে সমাধানের বদলে শুধু অজুহাত শোনা যায়। বিল দিতে দেরি হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, কিন্তু দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না দিয়ে যে হয়রানি করা হচ্ছে, তার জবাব কে দেবে?”
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করছেন গ্রাহকরা। অনেকেই দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎহীন জীবন যেন নবীগঞ্জবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে ভুলতা গ্রিডের কাছে ভুলতা-নরসিংদী ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইনের একটি কন্ডাক্টর ছিঁড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সমস্যা দেখা দেয়। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ হয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় নরসিংদী গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি স্প্যানের কন্ডাক্টর পরিবর্তনের কাজ শুরু হয়েছে। কাজের পরিধি ও জটিলতার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ সাময়িক এ দুর্ভোগের জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply