1. dailyhabiganjshomoy@gmail.com : shomoy2017 : দৈনিক হবিগঞ্জ সময়
September 13, 2026, 9:53 am

‘আর ফিরবো না এই দেশে (সৌদি) নিজের দেশে না খেয়েই মারা যাবো’

Reporter
  • Updated Thursday, October 25, 2018
  • 747

সৌদিতে ‘যৌনদাসী’ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশি নারীরা

সময় ডেস্ক :: ৪ঠা অক্টোবর। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বোর্ডিং, ইমিগ্রেশন শেষ। বিমানের অপেক্ষা। যাত্রীরা সবাই বসে আছে লাউঞ্জে। গন্তব্য সৌদি আরবের জেদ্দা। যাত্রী লাউঞ্জে অবাক করার মতো দৃশ্য। ফ্লাইটে অর্ধেকের বেশিই নারী যাত্রী। হাতেগোনা কয়েকজন যাত্রী ওমরাহ পালনে যাচ্ছেন। বাকি পুরুষরা যাচ্ছেন কাজের সন্ধানে। যাত্রী লাউঞ্জে কথা হলো এক তরুণীর সঙ্গে। বয়স উনিশ কিংবা বিশ বছর। বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। স্বামীর সঙ্গে সংসার টেকেনি। সাভারে ফিরে পিতার ঘরেও ঠাঁই হয়নি। কোথায় যাচ্ছেন- প্রশ্ন করা হলে জানালেন- ‘সৌদি যাচ্ছি’। সৌদিতে কী কাজ করবেন জানেন কী- উত্তরে না সূচক মাথা নাড়ালেন মেয়েটি। জানালেন- ‘আমরা কয়েক জন যাচ্ছি। দেশে তো কাজ পাচ্ছি না। দেখি সৌদিতে গিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারি কি না?’ তার মতো বহু নারী ওই দিন ফ্লাইটে সৌদিতে আরবে যাচ্ছেন। অনেকেই চোখে-মুখে খুশির ছাপ। তাদের নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন বাংলাদেশি পুরুষ। যাত্রী লাউঞ্জ থেকেই তাদের চোখে চোখে রাখছে দালালরা। মধ্য বয়সী এক নারীর বাড়ি মানিকগঞ্জ এলাকায়। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশে তার স্বামী ও সন্তান সবই রয়েছে। জমি বিক্রি করে দেড় লাখ টাকা তুলে দিয়েছেন এলাকার এক যুবকের হাতে। এরপর ওই যুবকই তাকে সৌদি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। ওখানে গিয়ে কী করবেন- প্রশ্ন করা হলে জানান- জানি না। তবে জেনেশুনেই আগুনে ঝাঁপ দিচ্ছি। কেউ নেই ওখানে। কিছু করার নেই। পরিবারের ভাগ্য উন্নয়নে এর চেয়ে বেশি তার আর কিছুই করার নেই। ওই দিন ফ্লাইটে যেসব মহিলা জেদ্দা পৌঁছলেন তাদের সবাই কাজের সন্ধানে সৌদি যাচ্ছেন।
সৌদি আরবের জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আসা নারীদের সম্পর্কে কথা বলতে গেলেই তাদের মুখ কালো হয়ে যায়। তারা জানালেন, বিমানবন্দর এলাকা পাড়ি দেয়ার পর তাদের আর দেখা মিলে না। তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেটিও জানি না। তবে মাঝেমধ্যে কিছু নারীর করুণ কাহিনী প্রবাসের মাটিতে তাদের আলোড়িত করে। বাসা-বাড়িতে আটকে রেখে তাদের সঙ্গে অমানুষিক আচরণ করা হয়। এসব কাহিনী সৌদিতে বসবাসকারী প্রায় সব বাংলাদেশিই জানেন। কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলেন না। মক্কা এলাকায় বসবাস করেন বাংলাদেশি সাংবাদিক সেলিম আহমদ। তার সঙ্গে কথা হয় কাজের সন্ধানে আসা নারীদের নিয়ে।
তিনি জানালেন, গেলো কয়েক মাসে ৪-৫ জন নারীর সঙ্গে তার নিজেরও কথা হয়েছে। যতটুকু পেরেছেন সাহায্য করেছেন। সৌদি আরবে আসার পর দালালরা তাদের বিক্রি করে দেয়। এভাবে কয়েক ধাপে বিক্রি হওয়ার পর সৌদির নাগরিকদের হাতে গিয়ে পড়ে। দাসদের মতো তাদের সঙ্গে বাসাবাড়িতে নির্যাতন করা হয়। আর এসব নির্যাতনে বাংলাদেশ থেকে আগত নারীদের কেউ কেউ মুমূর্ষু হয়ে পড়েন। তাদের সাহায্য করার মতো পরিবেশও থাকে না। সৌদি আরবে বাংলাদেশি বেশির ভাগ নারীদের ভোগের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওখানে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা। তারা জানান, জেদ্দা বিমানবন্দর পাড়ি দেয়ার পরপরই তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয়। এরপরও তাদের বিক্রি করে দালালরা। ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা নারী যারা নির্যাতন সহ্য করে টিকে থাকে তারা পরবর্তীকালে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ নারীই সেটি পারেন না। জেদ্দায় বসবাসকারী সিলেটের কাজিটুলা এলাকার বাসিন্দা আশিক উদ্দিন জানালেন, জেনেশুনে বাংলাদেশের দালালরা দেশ থেকে নারীদের এনে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বেহাত হতে হতে অনেক বাংলাদেশি নারী কোথায় চলে যায় শেষে তাদের হদিসই মিলে না। ভাগ্যবান যারা তারা কখনো কখনো বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সাহায্য পেয়ে থাকেন। কিন্তু অনেকেরই ভাগ্যে সেটি জুটে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা নারীদের খুব কমসংখ্যক মক্কা ও মদিনা আসেন। যারা আসেন তারা জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মামসহ কয়েকটি এলাকায় বেশি থাকেন এবং সৌদিয়ান শেখরাই তাদের কিনে নেন। এছাড়া দালালদের দ্বারাও তারা প্রায় সময় নির্যাতিত হয়ে থাকেন। প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে কতজন নারী সৌদিতে আসেন- তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান মেলে না। তবে জেদ্দা বিমানবন্দরে জমজম হাউস, ট্রলিম্যানের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক জানালেন, প্রতি মাসে কম করে হলেও ৪০০ থেকে ৫০০ নারী কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে আসেন। দালালদের মারফতেই তারা আসেন। কিন্তু ফেরার সংখ্যা কম। কাউকে কাউকে সৌদি আরব থেকে দুবাইয়েও নিয়ে যাওয়া হয়। দুলাল নামের এক ট্রলিম্যান জানান- যেসব নারী কাজের সন্ধানে আসেন তাদের ব্যবহার করা হয় যৌনদাসী হিসেবে। অথচ সৌদি আরবে আসার আগে এসব নারী কাজ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তাদের জানানো হতো, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ দেয়া হবে। ১৮ই অক্টোবর মধ্যরাত। জেদ্দা এয়াপোর্ট। বোডিং, ইমিগ্রেশন শেষ। জেদ্দা থেকে সিলেট হয়ে ঢাকাগামী বাংলাদেশ বিমানের অপেক্ষায় যাত্রীরা। ওই ফ্লাইটে বেশিরভাগই পুরুষ যাত্রী। নারীদের সংখ্যা খুবই কম। হাতেগোনা কয়েকজন নারী যাত্রী আছেন। এর মধ্যে ওমরাহ পালনে যাওয়া যাত্রীরাও রয়েছেন। জোৎস্না বেগম নামের এক মধ্য বয়সী নারী ৪-৫ জন মহিলা নিয়ে যাত্রী লাউঞ্জে অপেক্ষায় ছিলেন। বললেন, ‘কয়েক মাস আগে আমরা কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে এসে ছিলাম। সৌদিতে পা রাখার পরপরই আমাদের বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল। মাসে মাসে আমরা বিক্রি হয়েছি। আর যেখানেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখানেই আমাদের ওপর নির্যাতন চলছিল। আমাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, সেটি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আর ফিরবো না এই দেশে। নিজের দেশে না খেয়েই মারা যাবো।’ এরপরও সৌদি আরবমুখী হবেন না তারা। কথা যখন বলছিলেন তখন জোৎস্নার চোখের কোনায় জল জমে ওঠে। গলায় যেন আটকে যাচ্ছিল তার মুখের কথা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
© All rights reserved © 2017 dailyhabiganjshomoy.Com
Developer By Zorex Zira

Designed by: Sylhet Host BD