জসিম উদ্দিন তালুকদার ॥ ২৬শে মার্চ ১৯৭১ ভোর রাতে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী তরুণ শিক, নবীগঞ্জের কৃতিসন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ। গতকাল দুপুরে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরীর নেতৃত্বে স্মৃতিস্তম্ভের স্থান নির্ধারণ করা হয়। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে আসছে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদ অনুদ্বৈপায়ন স্মৃতিস্তম্ভের উদ্ভোধন করা হবে। নবীগঞ্জ সরকারী ডিগ্রী কলেজ ও শহীদ অনুদ্বৈপায়নের নিজ গ্রাম জন্তুরীর ত্রিমূখী রাস্তার মিলনস্থলের পাশে নির্মিত হবে প্রস্তাবিত শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কর্তৃক শহীদ বুদ্ধিজীবী অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে নিয়ে প্রকাশিত ডাক টিকেটকে প্রতিপাদ্য করে তৈরী করা হয়েছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের মূল নকশা। স্মৃতিস্তম্ভের স্থান নির্ধারণী অনুষ্ঠানে শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্রাচার্য সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন শহীদ অনুদ্বৈপায়ন স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক, সাংবাদিক উজ্জ্বল দাশ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নবীগঞ্জ বাহুবল আসনের সাংসদ এম এ মুনিম চৌধুরী বাবু, নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট আলমগীর চৌধুরী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জীতেন্দ্র দেবনাথ, নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সাবেক মেয়র অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম চৌধুরী, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা বেগম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল জাহান চৌধুরী, নবীগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র এটিএম সালাম, পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু দাশ রানা, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ মিলু, নবীগঞ্জ ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক রেজাউল ইসলাম, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি আমিনুর রহমান চৌধুরী সুমন, পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি ইকবাল আহমেদ বেলাল, সংস্কৃতিকর্মী নীলকন্ঠ দাশ সামন্ত নন্টি, সাংবাদিক মতিউর রহমান প্রমুখ। স্বাধীনতার পর নবীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তাঁর গ্রাাম জন্তুরী পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল অনুদ্বৈপায়ন সড়ক। কালের গর্ভে সেটি এখন কলেজ রোড নামেই অধিক পরিচিত। এখন আর কোথাও চোখে পড়েনা না অনুদ্বৈপায়ন সড়কের ফলক। নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কর্তৃক জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যকে নিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের এই প্রচেষ্ঠাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন নবীগঞ্জবাসী। উল্লেখ্য, শহীদ অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য ১৯৪৫ সালের ৩১শে জানুয়ারি নবীগঞ্জ উপজেলার জন্তুরী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতা দিগেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন নামকরা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। নবীগঞ্জ যুগল কিশোর (জে.কে) হাই স্কুলের কৃতি ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম অনুদ্বৈপায়ন। ১৯৬১ সালে স্কুল থেকে প্রথম শ্রেণীতে অংক ও সংস্কৃত বিষয় দুটিতে লেটার নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিকুলেশন (এস.এস.সি) উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ সালে এম.সি. কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে মেধা তালিকায় একাদশ স্থান অধিকার করে আই.এস.সি (উচ্চ মাধ্যমিক) পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে অনুদ্বৈপায়ন পদার্থবিদ্যায় প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অধিকারে বি.এস.সি সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফলিত পদার্থ বিদ্যায় প্রথম শ্রেনীতে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে এম.এস.সি. পাশ করেন। অনুদ্বৈপায়ন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নব প্রতিষ্ঠিত ফলিত পদার্থ বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। ১৯৬৮ সালের ১৪ই মার্চ ফলিত পদার্থ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন অনুদ্বৈপায়ন আর একই বছরের ১লা জুলাই জগন্নাথ হলের সহকারী আবাসিক শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। শহীদ অনুদ্বৈপায়ন শিক্ষকতাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কলম্বো প্লানের বৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য তার যাবার সব ব্যবস্থা চুড়ান্ত ছিল। ২৬শে মার্চ রাতে তার লন্ডনের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠার কথা ছিল। ভোর রাতে পাকবাহিনীর হাতে অন্যান্য মেধাবী ছাত্র শিক্ষকের সাথেই নির্মমভাবে নিহত হন অনুদ্বৈপায়নের ভট্টাচার্য।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply