দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে একসময়ের খরস্রোতা করাঙ্গী নদী এখন মৃতপ্রায়। বাহুবল উপজেলা জুড়ে নদীটির অধিকাংশ অংশে পানি শুকিয়ে মরা খালের রূপ নিয়েছে। এতে বিলুপ্তির পথে দেশীয় প্রজাতির মাছ, ব্যাহত হচ্ছে কৃষিকাজ এবং চরম পানি সংকটে পড়েছেন তিন ইউনিয়নের হাজারো মানুষ।
করাঙ্গী নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত খোয়াই নদী-এর একটি শাখা। ভারতের আসাম থেকে উৎপত্তি হয়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট সীমান্ত ঘেঁষে বাহুবল হয়ে বিভিন্ন হাওরে গিয়ে মিলিয়ে গেছে ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী। একসময় যার গড় প্রস্থ ছিল প্রায় ৩৫ মিটার এবং বর্ষায় কানায় কানায় পূর্ণ থাকত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর তলদেশে পলি জমে উঁচু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর মাঝখানে চর জেগে উঠেছে; দুই পাশে সরু নালার মতো অল্প পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অনেক স্থানে হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান পানি-আবার বিস্তীর্ণ অংশে শুকনো বালুচর। নদীর তলদেশে এখন ধান চাষ হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীরা নদীর ভেতরেই দোকান ও ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন বাজার ও কোম্পানির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীর তীরে। এতে পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশে ছড়াচ্ছে দূষিত বায়ু। দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা বালি ও পলি জমে নদীর নাব্যতা মারাত্মকভাবে কমেছে।
চুনারুঘাট অংশে বাঁধ নির্মাণ ও উজানে ড্যাম-বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে ভাটির বাহুবল অংশে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র পানিশূন্যতা।
রাজাপুর গ্রামের কৃষক রাসেল মিয়া বলেন, বাহুবল সদর, ভাদেশ্বর ও সাতকাপন ইউনিয়নের হাজারো কৃষক করাঙ্গী নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ করতেন। হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনে এ নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তারা। এখন সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, একসময় নদীতে বড় নৌকা চলত, দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ মিলত। এখন মাছ প্রায় নেই বললেই চলে।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সামিউন আসিফ বলেন, নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। তবে নদী পুনরুদ্ধারে মৎস্য বিভাগের কোনো পরিকল্পনা নেই এবং এ বিষয়ে সমন্বিত প্রকল্প তার দপ্তরের দায়িত্ব নয় বলেও জানান তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, নদী খনন কৃষি বিভাগের দায়িত্ব নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি, এডব্লিউডি পদ্ধতিতে ধান চাষ, তাপসহিষ্ণু গম ও ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারে কাজ চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২২ সালে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করে। তবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্পটি কাঙ্খিত ফল দেয়নি। খনন শেষ হলেও নদীর বড় অংশ আজও পানিশূন্য।
সচেতন মহল বলছেন, নদীর ঢালে চাষাবাদ বন্ধ, দখলমুক্তকরণ ও দ্রুত পুনঃখননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা পাবে।
পানি নদীর প্রাণ। সেই পানির অভাবে আজ হাহাকার করছে করাঙ্গী। কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অচিরেই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিতে পারে একসময়ের খরস্রোতা এই নদী।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply